হিউ ওয়াটসের পরামর্শ অনুসারে, সরকার ১৭৬৪-র ১১ই ডিসেম্বর একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত জমিদাররা নিয়মিতভাবে তাদের তশখিস [তশখিস (Tashkhis) জমিদারি বলতে সাধারণত ফার্সি শব্দ ‘তাশখিস’ (নির্ধারণ/মূল্যায়ন) থেকে উদ্ভূত এমন জমিদারির খাজনা নির্ধারণী প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যেখানে জমির উৎপাদনশীলতা যাচাই করে রাজস্ব বা জমির খাজনা নির্দিষ্ট করা হতো। এই প্রক্রিয়া মুঘল আমল থেকে চলে আসা, পরবর্তী কালে ব্রিটিশরা তাদের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার (যেমন — চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত) অংশ হিসেবে কাজে লাগিয়ে জমিদার আর রায়তের অধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করবে, যা পরবর্তীকালে জমিদারি প্রথা বিলোপ না হওয়া পর্যন্ত এই কাঠামো অব্যাহত ছিল। — অনুবাদক] পরিশোধ করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পেনশনভোগী করার সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার প্রয়োজন নেই। পরের বছর কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেয় যে মেদিনীপুর এমন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয় যে সেখানে বোর্ডের একজন সদস্যের সর্বক্ষণের উপস্থিতি অপরিহার্য হবে, এবং এই সিদ্ধান্তের ফলস্বরূপ মেদিনীপুর থেকে ওয়াটসকে প্রত্যাহার করা হয় এবং, বর্ধমানের রাজস্ব বন্দোবস্ত গঠনে ডব্লিউ. বি. সামনারের সহকারী টমাস গ্রাহামকে মেদিনীপুরে ওয়াটসের পদে পাঠানো হয়। এর কিছুদিন পরেই মেদিনীপুর হ্যারি ভেরেলস্টের তত্ত্বাবধানে আনা হয়। পদের মর্যাদা হ্রাসের বিরুদ্ধে গ্রাহাম প্রতিবাদ করেন। তার চিঠিটি শেষ হয়েছে এভাবে:
এখন পর্যন্ত বন্টন করা ইজারাগুলোর [ইজারা জমিদারি হলো এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে জমিদার বা সম্পত্তির মালিক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট রাজস্বের বিনিময়ে অন্য কারো (ইজারাদার বা মুস্তাজির) কাছে জমি ব্যবহারের অধিকার হস্তান্তর করেন। মুঘল আমলে প্রচলিত এই ব্যবস্থায় ইজারাদাররা মূলত মধ্যবর্তী রাজস্ব আদায়ের কাঠামো হিসেবে কাজ করতেন এবং ভূমি রাজস্ব প্রশাসনে অর্থের বিনিময়ে সাময়িকভাবে জমি দখলের অধিকার পেতেন – অনুবাদক] চেয়ে আরও বেশি সুবিধাজনক শর্তে জমি ইজারা দেওয়ার আপনার প্রস্তাবটি থেকে মনে হচ্ছে যে, এই প্রদেশের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে আপনাকে যথেষ্ট অবহিত করা হয়নি। কৃষকদের হাতে কোনো জমিই অধিকার নেই; সমগ্র জমিই রয়েছে এমন সব বংশানুক্রমিক জমিদারদের দখলে, যারা তাদের পূর্বপুরুষদের দেওয়া মূল জমিদারি সনদ থেকে তাদের জমি ভোগের অধিকার লাভ করেছেন। এই সনদ অনুযায়ী, সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করার পর অবশিষ্ট খাজনার ওপর তাদের অধিকার রয়েছে; এবং যখন এই বৃদ্ধি তাদের পূর্ববর্তী পাওনাগুলোর সাথে যোগ করা হবে, তখন আমি মনে করি না যে তাদের ভোগের জন্য সামান্য ভরণপোষণটুকুর বেশি কিছু অবশিষ্ট থাকবে, যা থেকে তাদের সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করা হলে, তা সবসময়ই তাদের প্রদান করতে হবে। (Firminger: Bengal District Records, Midnapur, vol. i, p. 42)
দেখা যায় যে, সিলেক্ট কমিটির থেকে পাওয়া আদেশ অনুযায়ী গ্রাহাম মেদিনীপুর আর জলেশ্বর জেলা বিস্তৃত ঘুরে সমীক্ষা করেছিলেন এবং পতিত জমিতে যে কৃষকদের বসত তৈরিতে উৎসাহ দেওয়ার তিনি বিপুল প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, সে প্রমাণ সরকারি নথিপত্রে পাওয়া যায়। এই ঘোরাঘুরির প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল জমির মূল্য সম্পর্কে উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ করা, যাতে ভবিষ্যতে রাজস্ব বৃদ্ধি হলেও কৃষকদের ওপর অত্যাচার না নেমে আসে। সরকার আশা প্রকাশ করেছিল যে রেসিডেন্ট প্রতি বছর একবার তাঁর জেলাজুড়ে ঘুরবেন। (Ibid. p. 48.)
মেদিনীপুরের নথিপত্র থেকে স্পষ্ট দেখা যায় যে, সেখানকার ইংরেজ শাসকদের প্রধান প্রাথমিক মনোযোগ ছিল বিভিন্ন স্থানীয় জমিদারির সুলুক সন্ধান বোঝার। নথিগুলোয় ‘জমিদার’ শব্দ অত্যন্ত শিথিলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘মেদিনীপুরের জমিদার’ হিসেবে একজন মহিলা রানী শিরোমণির কথা জানছি (Bengal: Past & Present, vol, x, p. 296)। রাণীর অধীনে বেশ কয়েকটা পরগনা ছিল, প্রতিটি পরগনার আলাদা আলাদা জমিদারও ছিল। আবার, কসিজোরা (কাশীজোড়া) পরগনায় বাসকরা ৩,৭০০টি পরিবারের মধ্যে ১,৫০০টি পরিবারকে ‘খুশনিশান’ (Khushnishans) বলা হচ্ছে এবং রেসিডেন্ট তাদের বিষয়ে বিস্তৃতভাবে বলছেন : —
কারো কারো কাছে তাদের সমস্ত সম্পত্তি অধিকারের প্রমান হিসেবে প্রাক্তন রাজা, নবাব বা জমিদারদের দেওয়া আসল সনদপত্র আছে, এবং কারো কারো কাছে সম্পত্তির একাংশের সনদ রয়েছে; কেউ কেউ নিজেরা জাল সনদপত্র তৈরি করেছে, এবং অন্যরা ভান করছে তাদের পূর্বে সনদপত্র ছিল, কিন্তু আগুন, চুরি বা অন্যান্য দুর্ঘটনায় সেসব হারিয়ে গিয়েছে; এবং তারা সবাই, যখনই কোনো জমি অনুদান, জালিয়াতি, ঘুষ বা প্রতারণার মাধ্যমে একবার নিজেদের দখলে নিয়েছে, তখন জমিদারদের কোনো জমি পুনরুদ্ধার করা থেকে বিরত রাখার জন্য একত্রিত হতে কখনো ব্যর্থ হয়নি।
মিঃ ওয়াটস, জেলায় অবস্থানকালে, এই খুশনিশানদের দাবি পরীক্ষা করার জন্য পাঁচ ব্যক্তিকে নিযুক্ত করেন এবং মিঃ গ্রাহাম আরও একজনকে এদের সঙ্গে জুড়ে দেন। এই ব্যক্তিরা সেই অধিকার অনুযায়ী বেশ কিছু জমিদারিতে পৌঁছে তদন্ত করেন; এবং এই তদন্তে কিছু জমিদারি খুশনিশান জালিয়াতিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায়, রাজা তাদের থেকে খাজনা আদায়ে জোর দেন। তবে, তাদের এই কাজ করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুমতি দেওয়া হয়নি, এবং বেশিরভাগ দাবিও পরীক্ষা করা যায়নি, বা সেসবের অনেকগুলোর সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই, আমি তদন্তকারীদের সংখ্যায় আরও একজনকে যুক্ত করেছি, যাকে খুশনিশানরা নিজেরাই চেয়েছিল; এবং একজন তহসিলদার, দুজন আমিন, ডেপুটি চৌধুরী, ডেপুটি কাজী এবং দুজন কানুনগো নিয়ে সাতজনের দলের ব্যবহারের জন্য আমি নিম্নলিখিত মর্মে একটা পরোয়ানা জারি করেছি – যে তারা সমস্ত খুশনিশানদের দাবি পরীক্ষা করবে; যদি তারা সর্বসম্মতিক্রমে কারও দাবির ন্যায্যতা সম্পর্কে একমত হয়, তবে রাজা তাদের দ্বারা স্বাক্ষরিত একটা নতুন সনদ তাকে প্রদান করবেন; যদি তারা সর্বসম্মতিক্রমে দাবির অন্যায্যতা সম্পর্কে একমত হয়, তবে তারা তাদের স্বাক্ষর ও মোহরসহ রাজাকে একটা লিখিত অনুমতি দেবে, যাতে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ জমিগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারেন; রাজা উক্ত লিখিত অনুমতি পাওয়ার পর যখন খুশি জমিগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারবেন, যদি না দখলদার অন্য রায়তের মতো একই পদ্ধতিতে পট্টা নিতে এবং খাজনা দিতে সম্মত হয়; যদি উল্লিখিত সাতজনের মধ্যে কেউ কোনো দাবির ন্যায্যতা বা অন্যায্যতা সম্পর্কে অন্যদের থেকে ভিন্নমত পোষণ করে, তবে সে মতটি আমার কোর্টে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পাঠাতে হবে, এবং তারা তাদের কার্যক্রমের সাপ্তাহিক হিসাব আমাকে পাঠাবে। এই উপায়ে কোম্পানির মালগুজারিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি যুক্ত করা যেতে পারে, এবং এই পদ্ধতিতে কারও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা খুব কম। অতএব, আপনার অনুমতি নিয়ে, আমি অন্যান্য প্রতিটি পরগনাতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করব, এবং যেখানে আমার কাছে অনুরূপ অভিযোগ করা হবে, সেখানে আমি প্রতিটি পরগনার খুশনিশানদের সংখ্যা সম্পর্কেও যথাসম্ভব নিখুঁতভাবে তথ্য সংগ্রহ করব, এবং ভবিষ্যতে এটি বিবেচনার যোগ্য হতে পারে যে যাদের সনদ আছে তাদের একটা বড় অংশকে কিছু খাজনা দেওয়ার আওতায় আনা উচিত কিনা, ধরা যাক অন্য রায়তের খাজনার অর্ধেক (and it, may hereafter be worthy of consideration whether a great part of those who have sunnuds ought not to be subjected to the payment of some rents, suppose half of what is paid by other ryots)।”
মেদিনীপুরে নিজেদের পকড় প্রতিষ্ঠা করার পরপরই ইংরেজরা বুঝতে পারল, জেলার পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে, প্রদেশের সীমানার মধ্যে এক বিশাল এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েগিয়েছে। তারা দেখল এই বিস্তৃত অঞ্চলের জমিদারেরা আলীবর্দী খানের শাসনামলে মারাঠা হ্যঙ্গামের সময় থেকে রাজস্ব জমা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই, ১৭৬৭-র শুরুতে গ্রাহাম, লেফটেন্যান্ট জন ফার্গুসনকে এই অঞ্চলে অভিযানে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই সমর অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল এই “জঙ্গল” অথবা “পশ্চিমী” জেলাগুলোর জমিদারদের কোম্পানির বশে নিয়ে আসা। এভাবে শুরু হওয়া মেদিনীপুরের পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক অভিযান, শেষ পর্যন্ত বর্ধমান জমিদারির জেলাগুলোতেও বিস্তৃত হয়েছিল। যে নথিপত্র এই অঞ্চল দখলদারি চালানোর কাজের প্রমান পেশ করে, সেই নথি সূত্রে বুঝতে পারি এই বন্য, জঙ্গলে ঢাকা এবং আকস্মিক ও ব্যাপক বন্যায় প্লাবিত দেশের প্রাকৃতিক, সামাজিক অসুবিধা সত্ত্বেও কী ধরনের বিচক্ষণতা আর দৃঢ় দক্ষতায় কোম্পানি তার অঞ্চল বৃদ্ধির কাজ সম্পন্ন করেছিল।
নথিপত্রে এই জঙ্গলের গোষ্ঠী প্রধানদেরকে ‘বিদ্রোহী লুটেরা’ হিসেবে বর্ণনা করাটা মোটেই অযৌক্তিক নয়, এবং এই নথিতেই বলা হয়েছে তাদের প্রজারা ‘চুয়াড়, যারা চাষাবাদ করার পাশাপাশি লুটতরাজ চালানোর জন্যও প্রশিক্ষিত’। অন্যদিকে, ইংরেজ অফিসারকে সতর্ক থাকতে হতো, পাছে তার সৈন্যদল যেন “সেইসব লুটেরাদের তুলনায় দেশের সাধারণ মানুষের কাছে আরও বড় কষ্টের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, যাদের জন্য আমরা উদ্যমী হয়ে তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করছি।” ১৭৮১-এ এই জমিদারদের কয়েকজন তাদের দেশের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখেন, “এটি একটা জঙ্গল; তাদের খাজনা হলো এক ধরনের নামমাত্র কর, যা তাদের পাইক ও চুয়াড়দের থেকে আদায় করা হয়; তারা চারদিকে জঙ্গল জমিদার অঞ্চল পরিবেষ্টিত; পূর্বে বগড়ি ও বিষ্ণুপুর; উত্তরে পাচেট [পঞ্চকোট বা পাঞ্চেত]; পশ্চিমে সিংভূম; দক্ষিণে দামোদর ভঞ্জ, ময়ূরভঞ্জের রাজা; এঁরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, এবং মেদিনীপুর থেকে কোম্পানির কাছে আবেদন করে প্রতিকার পাওয়া সত্ত্বেও তারা প্রায়শই মারাঠাদের আক্রমণের শিকার হয়।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ