চট্টগ্রামের একের পর এক প্রশাসক এতটাই জমার পরিমান বাড়িয়েছিলেন যে ৪৬ বছরে মূল জমা বেড়ে হল ৩-১৩-১০.৫ টাকা এবং মোট জমা হল ৩,৩১,৫২৯-১-১৫ টাকা। বলা হয় মহম্মদ রেজা খান আমলে আদায় হয়েছিল ৩,৩৭,৭৬১-১-১১.৭৫ টাকা। মাল বা ভূমি রাজস্ব ছাড়া অন্য আদায়ও ছিল এবং ইংরেজ প্রশাসনে জেলার বিদ্যমান জমা এই হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে। (রাজস্ব জায়গিরের ব্যাখ্যার জন্য দেখুন কটন, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৭)

মুঘল শাসনামলে ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধির এই সমীক্ষা সূত্রে কলকাতা কাউন্সিল একটা আদেশ জারি করে (২৪শে জুন, ১৭৬১): ‘যেহেতু চট্টগ্রামের খাজনা ক্রমাগত বৃদ্ধি করা হয়েছে, তাই সেই খাজনা আরও বাড়ান; তবে সে ক্ষেত্রে কোম্পানির স্বার্থ দেখবেন এবং বাসিন্দাদের স্বাচ্ছন্দ্য যাতে ব্যহত না হয় সেটাও দেখবেন।’
সন্দেহ নেই, ভেরেলস্টের রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি “সরাসরি” (direct) ছিল। তার রেসিডেন্সির প্রাথম যুগে, জেলা জুড়ে যে নোটিশ ছড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাতে বলা হয়েছিল “প্রাক্তন গভর্নরদের স্বাক্ষরওয়ালা পারওয়ানা এবং শুল্কমুক্ত জমি রাখার অধিকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে বাংলা রীতি অনুযায়ী, ১লা এপ্রিল বা তার আগে, জমির অধিকার পরীক্ষা, নিশ্চিতকরণ এবং জমি পঞ্জীকরণের জন্য সশরীরে কাছারিতে হাজিরা দিতে হবে… যে এই আদেশ অবহেলা, অমান্য করবে, কোম্পানি তার জমি জবরদখল করার অধিকারী হবে; এর জন্য দেড় মাস সময় দেওয়া হল।” সকলেই জানে “দানে পাওয়া জমি সাধারণত পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়,” এই মর্মে তিনি গভর্নরকে বার্তা দিয়ে জানতে চান এই রাজস্বমুক্ত জমি উদ্ধার করা আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হবে কিনা। তাকে উত্তর পাঠানো হল : “বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া দাতব্য জমি বর্তমান মালিকদের মৃত্যুর পরে কোম্পানি দখল নেবে।” উদ্ধার হওয়া পতিত জমি তিন থেকে চার বছর জন্য রাজস্বমুক্ত হল, সেই মেয়াদ শেষে প্রতিবছর রাজস্ব বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হল।
৪ঠা জানুয়ারি, ১৭৭২ থেকে আগস্ট, ১৭৭৮-এর মধ্যেকার সময়ে, লাকিপুর-এর বাণিজ্যিক চিঠিপত্রের একটামাত্র খণ্ড ছাড়া (লাকিপুরে কোম্পানি ১৭৫৮ থেকে তালুকদারি স্বত্বে জমি ধারণ করছিল। দেখুন ইম্পেরিয়াল রেকর্ড ডিপার্টমেন্ট, হোম ডিপার্টমেন্ট, ভারত সরকারের রেকর্ড, পাবলিক কার্যবিবরণী, ২৮শে জুন, ১৭৫৯), চট্টগ্রামে স্থানীয় রেকর্ড সংরক্ষিত নেই। তার গ্রন্থে ভেরেলস্ট লিখলেন : “মিঃ ভেরেলস্ট ১৭৬১-র শুরুতে প্রধান পদে নিযুক্ত হন এবং ১৭৬৫-তে পদত্যাগ করেন। এই প্রদেশ ঘন ঘন গোলযোগের আবর্তে জড়িয়ে পড়ার কারনে এই অঞ্চলের রাজস্ব, শান্তিপূর্ণ অঞ্চলের তুলনায় বেশি ওঠানামা করেছে। তবে উল্লেখ করা যেতে পারে বাংলার সুবাদাররা দুই লক্ষ টাকার বেশি রাজস্ব পেতেন বলে মনে হয় না।” প্রাথমিক বছরগুলিতে ইংরেজদের আদায় করা অর্থের পরিমাণ ভেরেলস্ট সূত্রে পাচ্ছি:-

চট্টগ্রামের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকাকালীন, ভেরেলস্ট মণিপুরে এক সামরিক অভিযানে কাছাড়ের অনেকটাই ভেতরে পৌঁছেছিলেন। উনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত ব্রিটিশ রেকর্ডে কাছাড় সম্বন্ধে উল্লেখ এতটুকুই।
১৭৬৫-র দেওয়ানি ভূমি হাতবদল প্রক্রিয়া চট্টগ্রামে কোম্পানির প্রশাসনের চরিত্র প্রভাবিত এখানে এমন কোনো “কালো কালেক্টর” ছিলেন না যাদের কোম্পানির ইউরোপিয় চুক্তিবদ্ধ কর্মচারী দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যায় [কারন আগেই জানানো গিয়েছে কোম্পানি চট্টগ্রামে সরাসরি কাছারিতে জমাপড়া রাজস্ব আদায় করত – অনুবাদক]।
১৭৭৩-এ অঞ্চলে অঞ্চলে Provincial Comptrolling Councils (প্রাদেশিক রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল ) প্রতিষ্ঠিত হলে চট্টগ্রামের প্রশাসনিক প্রধান আর কাউন্সিল সরাসরি ফোর্ট উইলিয়ামের সর্বোচ্চ রাজস্ব কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখত বলেই চট্টগ্রাম এই কাউন্সিলের অধীনে আসে নি ।
ফৌজদারি বিচার প্রশাসনে, প্রধানকে ফৌজদারি এখতিয়ারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হল। ফৌজদার রায় ঘোষণা করত এবং সেই রায় অবশ্যই নায়েব নাজিমের অনুমতি পাওয়ার জন্য জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। সেই রায় প্রত্যায়িত হয়ে ফিরে এলে, সেই নির্দেশ কার্যকরী হচ্ছে কি না সেটা দেখার দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক প্রধানের। চট্টগ্রামের রেকর্ডে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ফৌজদারের রায় যে শাস্তি বরাদ্দ করেছে, সেই শাস্তি মুর্শিদাবাদে নাজিমের কাছারিতে বেড়ে যদি অঙ্গচ্ছেদ বা ফাঁসিতে পরিণত হচ্ছে, তখন রেসিডেন্ট সেই আদেশ মুর্শিদাবাদ থেকে চট্টগ্রামের মত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে ফোর্ট উইলিয়ামে ঊর্ধ্বতনদের পরামর্শ চাইতে যেতেন।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ