দক্ষিণপশ্চিম সীমান্তবাংলার প্রাণের পরব ‘জাওয়া-করম’। ভাদ্র মাসের প্রতি সন্ধ্যায় দক্ষিণপশ্চিম সীমান্ত বাংলার বেশিরভাগ এলাকায় মেয়েদের গলায় যে গান শোনা যায় তা তাদের প্রাণেরই স্পন্দন। সঙ্গে চলতে থাকে নাচও। ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে হাত নেড়ে নেড়ে তালে তালে পা ফেলে কোমর দুলিয়ে সামনে এগিয়ে আবার কিছুটা পিছিয়ে ছন্দোময় গতিতে গানের সঙ্গে এই নাচ চলতে থাকে। যা ‘জাওয়া নাচ’ নামে পরিচিত। গানও ঐ নামে পরিচিত। কুড়মালি শব্দ ‘জাওয়া’ যার অর্থ ‘পুনর্জনম’ থেকে জাওয়া কথাটির উৎপত্তি। আর ‘কর্ম’ থেকে ‘করম’। মাহাত, ভূমিজ ও আদিবাসী সাঁওতালদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায় করম আসলে তাদের কাছে দেবতা বা ঠাকুর। তাদের বিশ্বাস করম ঠাকুর খুবই শক্তিশালী, তিনি সুখ, সমৃদ্ধি এবং মঙ্গল সাধন করতে পারেন। তাই মেয়েরা ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় এই উৎসব পালন করে। মূলত কুমারী মেয়েরাই করম পালন করে, তবে যেসব মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে আছে তারাও এই উৎসবের সময় বাপের বাড়িতে যায়। করম পরবের সময় বিবাহিতা মেয়েরা অপেক্ষা করতে থাকে কখন বাপের বাড়ির লোক আসবে নিয়ে যেতে। সে জানে কেউ আসুক আর না আসুক তার পিঠের ভাই তাকে নিয়ে যেতে আসবেই। তাই বিবাহিত মেয়ের কণ্ঠে শোনা যায় : —
“না আইল কাকা মোর না আইল বাপ /চলি চলি আইল মোর পিঠকর ভাই।”
এই সময় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে তাদের নববধূর জন্য করমের একদিন আগেই করম পূজার সামগ্রী পাঠায় যাকে তারা বলে করম ডালা পাঠানো। এতে থাকে নববধূর জন্য শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ ও নানান প্রসাধনদ্রব্য যথা- সুগন্ধি পাউডার-সাবান, আলতা, সিঁদুর, টিপপাতা, কাজল প্রভৃতি। শুধু তাই নয় শ্বশুরবাড়ি থেকে বিভিন্ন রকমের পিঠা, মিঠাইও পাঠায়। অন্যান্য আত্মীয়রাও তাদের নববধূকে দিয়ে থাকেন নানান উপহার।
দুই
ভাদ্রমাসের শুক্লা একাদশী (পার্শ্ব একাদশী) তিথিতে করম উৎসব পালন করা হয়। এর পাঁচ কিংবা সাত দিন আগে মেয়েরা জাওয়া পাতে। কুমারী মেয়েরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে বন-জঙ্গল থেকে শালের দাঁতুন ভেঙে আনে। তারপর জোড়ে (ছোট নদী) কিংবা পুকুরে হলুদ তেল মেখে স্নান করে ছোট ছোট ঝুঁড়ি কিংবা ডালায় বালি ভর্তি করে তার উপর মুগ, কুত্থি, রমা, সরিষা, বিরি, ভুট্টা ইত্যাদির বীজ ছড়িয়ে হলুদ জল ছিটিয়ে জাওয়া পাতে। স্নানের ঘাটে জাওয়া ডালির সামনে ঝিঙা পাতায় তেল-হলুদ-দাঁতুনকাঠি রেখে দল বেঁধে হাত ধরাধরি করে গানের সাথে নাচ আরম্ভ করে।
তিন
মা যেমন সন্তানকে লালন-পালন করে তেমনই মেয়েরাও ওই ভাবে জাওয়া ডালিকে আগলে রাখে। তাই এতে অংশগ্রহণকারিণী মেয়েদের বলা হয় জাওয়ার মা। জাওয়ার মায়েদের কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। বাসি খাওয়া চলবে না। টক, ঝাল ছাড়াও বেশি গরম খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ। প্রতিদিন স্নান করে হলুদ গোলা জল জাওয়ার উপর ছিটিয়ে দিতে হবে। সদা সতর্ক দৃষ্টি থাকে জাওয়া ডালির উপর।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় আঙিনায় বা আখড়ায় পিঁড়ির উপর জাওয়া ডালি রেখে হলুদ জলের ঝাপটা দেয়, যাতে ভালভাবে অঙ্কুর বের হয়। এরপর গাইতে থাকে জাওয়া গীত। সঙ্গে নাচও। গানে গানে তারা করম গুঁসাই-এর কাছে তাদের ভাইয়ের মঙ্গল কামনা করে থাকে। প্রার্থনা জানায় ভাইয়ের দীর্ঘ পরমায়ুর। কামনা করে শস্য সমৃদ্ধির। তবে যাইহোক, এই করম-জাওয়া গীতে নারী সমাজের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথাই ধরা পড়ে। ভাদ্র মাসে রাজভাণ্ডারও শূন্য হয়ে যায়। সাধারণ চাষার ভাঁড়ার তো দূরের কথা। তাই অভাবের দিনে জনহার(ভুট্টা, গুঁদলু ইত্যাদি খেয়েই দিন কাটাতে হয়। কিন্তু খেতে কার আর ভালো লাগে ? তাই গায়-
“বাসি মাড় বাসি মাড় সেহঅ বরুম ভালঅ গ। / দিনে তিন ধাঁউ নহই ভালঅ জনহারেকর লেট হ।।”
এমনই ভাবেই গানের মধ্য দিয়ে উঠে আসে শ্বশুর-শাশুড়ি-ভাসুর-ননদ-দেওরের আচার-ব্যবহারের কথা। শ্বশুর বাড়িতে কোনো কিছুরই অভাব নেই, তবু শাশুড়ির কারপণ্য। তাই স্বামীর কাছে অভিযোগ করে গানে গানে –
“সারাদিন সারারাইত গুড়ি কুটলম গ / তবু হুনা স্থানে দেল গটল পিঠা গ…”
চার
দেখতে দেখতে চলে আসে করমের দিন অর্থাৎ পার্শ্ব একাদশীর দিন। গ্রামের কুমারী মেয়েদের ব্যস্ততার দিন। এর আগের দিন ‘মঁজত’ করার দিন। দিনের বেলায় স্নানের সময় জলের ধারে তিনখানা বা পাঁচখানা করে ঝিঙা পাতা বিছিয়ে প্রতি পাতায় এক টুকরো করে ছোট ছোট দাঁতন কাঠি বসিয়ে সে গুলোর উপর তেল হলুদ মাখিয়ে দেয়। তারপর পাতাগুলোর চারপাশে জল ঘুরিয়ে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে। নিজেও হলুদ-তেল মেখে স্নান করে বাড়ি ফেরে।

রাত্রিতে চাল গুঁড়ির পিঠে করে ঘরের চালের(ছাউনি) উপর আবার সেই স্নানের ঘাটের মতো করেই ঝিঙেপাতার উপর টুকরো-টুকরো পিঠে রেখে দেবতা উদ্দেশ্যে সমর্পন করে। পরের দিন (করমের দিন) নির্জলা উপবাস। ভোরে উঠে গান গেয়ে জাগিয়ে নেয়। তারপর দল বেঁধে বনে যায়, বন থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে আসে করম পূজার উপকরণ— ফুল, শালপাতা, শালদাঁতন, কেয়া ফুল, আমলকি, হরিতকি, ধানপাতা প্রভৃতি। বনের ধারে ধানখেতের পাশে চলতে থাকে নাচগান—
“আইজ রে করম গুঁসাই ঘারে দুয়ারে রে। / কাইল রে করম গুঁসাই কাঁস লদী পার।।”
এদিন সন্ধ্যায় গ্রামের কোনো একটি করম আখড়ায় করম গাছের(শাল) ডাল এনে পোঁতা হয়। পাশাপাশি দুটি ডাল গাড়া (পোঁতা) হয়। একটি ‘করম’ অর্থাৎ সূর্য দেবতার নামে অন্যটি বসুমতি মায়ের নামে। ডাল দুটি সুতো দিয়ে বেড় (ঘিরে) দেওয়া হয়। হলুদ রাঙানো কাপড় টুকরো তাতে জড়ানো হয়। গ্রামের লায়া পূজা করে। উপবাসী মেয়েরা স্নান করে, নতুন কাপড় পরে (অথবা কাচা কাপড়) ফুল-ফল ও অন্যান্য সামগ্রী (প্রদীপ সহ) ডালায় সাজিয়ে করম ডালের তলায় আসে। লায়ার নির্দেশ মতো করম ডালের কাছে সন্ধ্যা-প্রদীপ উৎসর্গ করে। লায়ার পূজা হয়ে গেলে পূজারি পূজা শুরু করে। একে একে উপবাসীরা পুষ্পাঞ্জলি দেয়। পূজা শেষ হলে লায়া ব্রতীদেরকে কর্মূ-ধর্মূর উপাখ্যান শোনায়। যা মূলত করম ঠাকুরের মাহাত্ম্য কীর্তন। সবশেষে যৎসামান্য খাবার খেয়ে, খানিক বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু হয় নাচ-গান। চলতে থাকে রাতভর। পরদিন সূর্য ওঠা পর্যন্ত।
পাঁচ
‘জাওয়া’ মূলত দুই প্রকারের— ‘সাঁচি জাওয়া’ ও ‘সাধারণ জাওয়া’। নয় বছরের কম বয়সী মেয়েদের জাওয়া হল ‘সাঁচি জাওয়া’, দশ বা তার বেশি বয়সের মেয়েরা যে জাওয়া পাতে তা ‘সাধারণ জাওয়া’ নামে পরিচিত। তবে জাওয়া তোলে শুধুমাত্র কুমারী মেয়েরা। কিন্তু সাঁওতাল সমাজে পাঁচ রকমের করম পরব হয়। যেমন— ‘মাঝি করম’, ‘ডাঙ্গুয়া করম’, ‘গুরু করম’, ‘চেলা করম’ এবং ‘মাঃ মড়ে করম’। মাঝি নির্বাচিত হলে- ‘মাঝি করম’। সাঁওতাল সমাজে মেয়ে বড় হলে বা বিবাহযোগ্যা হলে- ‘ডাঙ্গুয়া করম’, গুরু যখন শিষ্যদের মন্ত্র-তন্ত্র শিক্ষা দেবার ভার নেয়, তখন হয়— ‘গুরু করম’। শিক্ষা শেষে ‘চেলা করম’, রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত হলে ‘মাঃ মড়ে করম’। সাঁওতালদের সমাজে এমনও নিয়ম আছে যে কারোর উঠোনে বা জমিতে যদি ‘করম গাছ’ (শাল গাছ) জন্মায় তাহলে তাকে অনুষ্ঠান করতে হয়।
ছয়
করম আখড়ায় শুধু মেয়েরাই অংশ নেয় না, পুরুষরাও ধামসা-মাদল ইত্যাদি বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে তালে-তালে জাগরণের সময় নাচ করে। পরদিন সূর্যোদয়ের পর মেয়েরা করম-ঠাকুর বিসর্জন করে। ডালার জাওয়া ঘরের চালে (ছাউনিতে) ও সবজি বাড়িতে ছড়িয়ে দেয়। এভাবেই মানভূম তথা পুরুলিয়ার বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের আদিবাসী ও কুড়মি সমাজ তাদের প্রাণের পরব, লোক-ঐতিহ্য ‘জাওয়া-করম’ তথা ভ্রাতৃমঙ্গল ও শস্য কামনার উৎসবকে এখনও টিকিয়ে রেখেছে। বিশ্বায়নের করাল গ্রাস থেকে এই লোক-ঐতিহ্যকে রাখতে এগিয়ে এসেছেন কয়েকজন সহৃদয় লোকসংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ যাদের মধ্যে উল্লেখ করা যায় সৃষ্টিধর মাহাতোর কথা। যিনি ১৯৯৭ সালে বিভিন্ন বয়সের পয়ঁতাল্লিশজন মেয়েকে নিয়ে পুঞ্চা ব্লকের জামবাদ গ্রামে গঠন করেন ‘জামবাদ মিলন আখড়া’র— ‘জাওয়া-করম’ দল। এই জেলারই জয়পুর ব্লকের চড়কু মাহাত তাঁর সহযোগীদের নিয়ে করম পূজার দিন ‘গোবিন্দ ট্যাঁড়’ (ফরেস্ট মোড়, মণিপুর)-এ আয়োজন করেন ‘করমগীতি প্রতিযোগিতা’ –যা দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে।
তথ্যসূত্র :
১. ড. সুধীরকুমার করণ, সীমান্ত বাংলার লোকযান, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা, দ্বিতীয় সং ১৪০২
২. মারাংবুরু (পত্রিকা), ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, পৃ. ৪৭-৬১
৩.পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি, ড. মিতা ঘোষ বক্সি, অক্ষর প্রকাশনী
৪. পশ্চিমবঙ্গ, পুরুলিয়া জেলা সংখ্যা ২০০৭, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, প.ব. সরকার
লেখক পরিচিতি : পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার মণিপুর স্বামী বিবেকানন্দ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় বাংলার শিক্ষক ও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম গবেষক।